ঢাকাSaturday , 7 May 2022

মুঘল বাদশাহ আকবরের জীবনীঃ

Link Copied!

জন্ম : ১৫৪২ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই অক্টোবর।

সম্পূর্ণনাম : মির্জা আব্দুল-ফতহ-জালাল উদ্দিন মহম্মদ আকবর।

পিতার নাম : নাসিরুদ্দিন মহম্মদ হুমায়ুন।

মাতার নাম : হামিদা বানু বেগম।

রাজত্ব : ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১১ই ফেব্রুয়ারিরাজ্যাভিষেক : ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ই ফেব্রুয়ারি।

পূর্বসূরী : হুমায়ুন
উত্তরসূরি : জাহাঙ্গীর
রাজপ্রতিভু : বৈরাম খাঁ (১৫৫৬ – ১৫৬১)।

পত্নীগণ :১.রুকাইয়া সুলতান বেগম ২. বেগম নাথি বাঈ। ৩. মারিয়াম-উজ-জামানি বেগম ৪.সেলিনা সুলতানা বেগম ৫. বেগম রাজ কানয়ারি বাঈ ৬. রাজিয়া সুলতান বেগম7. বিবি দৌলত শাদ বেগম

বংশধর :- ১. জাহাঙ্গীর (পুত্র) ২. মুরাদ (পুত্র) ৩. দানিয়েল (পুত্র) ৪. হাসান (পুত্র) ৫. হুসেইন (পুত্র) ৬. আরাম বানু বেগম (কন্যা) ৭.শাকর উন্নিসা বেগম (কন্যা) ৮. শেহজাদী খানুম (কন্যা)

রাজবংশ : মুঘল রাজবংশ (তৈমুরীয় বংশ)।

ধর্ম : “দীন-ই-ইলাহী”

মৃত্যু : ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দের ২৭শে অক্টোবর ফতেপুর সিক্রিতে (আগ্রায়)।
সমাধি স্থল: সিকেন্দ্রায় (আগ্রা)

জন্ম : ১৫৪২ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ই অক্টোবর মাতা হামিদা বানুর কোল আলোকিত করে এই সুন্দর ভুবনে অমরকোটের রাজা রানা বীরশালের গৃহে মুঘল সাম্রাজ্যের তৃতীয় সম্রাট আকবর জন্মগ্রহণ করেন।

সিংহাসন আরোহন
১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে পিতা হুমায়ুনের মৃত্যুর পর আকবর (হুমায়ুনের জ্যেষ্ঠপুত্র)১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১১ই ফেব্রুয়ারি দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন মাত্র ১৩ বছর ৪ মাস বয়সে। কিন্ত তাঁর রাজ্যাভিষেক হয় ১৪ই ফেব্রুয়ারি ১৫৫৬ সালে।


  1. এই সময় নাবালক মুঘল সম্রাটের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন হুমায়ুনের বিশ্বস্ত বন্ধু বৈরাম খাঁ। আকবর সিংহাসনে আরোহণ করেই দিল্লীর জামি মসজিদে নিজের নামে খুদবা পাঠ করে “শাহেনসা” উপাধি নেন। অভিভাকক বৈরাম খাঁ প্রধানমন্ত্রী বা “ভকিল-উল্-সুলতানেত”- রূপে নিযুক্ত হন এবং আকবরের কাছ থেকে “খান-ই-খানান“-উপাধিতে ভূষিত হন। এই সময় রাজ্য পরিচালনা করতেন বৈরাম খাঁ কারণ এই সময় আকবর নামে মাত্র সম্রাট ছিলেন।

হিমুর সঙ্গে যুদ্ধ
আকবরকে দিল্লীর সিংহাসন থেকে অপসারিত করার জন্য চুনার দুর্গের অধিপতি মহম্মদ আদিল শাহের হিন্দু সেনাপতি হিমু বা হেমচন্দ্র বক্কাল বিশাল সেনাদল নিয়ে আগ্রার অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন এবং অতি সহজেই আগ্রা দখল করে নেন। এরপর তিনি দিল্লীর উদ্দেশ্যে রওনা দিলে দিল্লীর শাসনকর্তা তার্দি বেগ তাকে বাঁধা দেন। কিন্তু তিনি পরাজিত হয়ে আগ্রায় পলায়ন করেন। ফলে দিল্লী হিমুর অধিকারে চলে আসে। হিমু “বিক্রমাদিত্যে”-উপাধি নিয়ে নিজেকে সম্রাট বলে ঘোষণা করেন। ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে হিমুকে শাহেস্থা করার জন্য বৈরাম খাঁ দিল্লীর অভিমুখে অগ্রসর হন।পানিপথে উভয়ই যুদ্ধে লিপ্ত হন।

এই যুদ্ধ ইতিহাসে পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ (১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৫ই নভেম্বর) নামে পরিচিত। এই যুদ্ধ হিমুর হস্তী বাহিনী বৈরাম খাঁর বাহিনীকে প্রায় তছনছ করে ফেলে। মুঘল বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় কিন্তু অর্কাসাৎ একটি তীর হিমুর চোখে বিদ্ধ হলে হিমু সংজ্ঞাহীন হয়ে যায়। কিন্তু নেতৃত্বের অভাবে হিমুর বাহিনী অসহায় হয়ে পড়লে এই সময় বৈরাম খাঁ সুযোগ বুঝে আক্রমণ করে হিমুকে বন্দী করে এবং বৈরাম খাঁ এই যুদ্ধে প্রায় ২৫০০ হাতি সহ বিপুল পরিমান যুদ্ধের উপকরণ অধিকার করতে সক্ষম হন।

এরপর বৈরাম খাঁর নির্দেশে শাহ কুলীনখান মাহরম আহত হিমুকে হত্যা করে দিল্লীর রাজপথে ফাঁসি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখেন। শেরশাহের বংশধরদের একজন শাসক ছিলেন আহম্মদ শাহ শূর,যিনি পাঞ্জাবে সিকান্দার শাহ শূর নাম ধারণ করে রাজত্ব করতেন। পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধের আগেই উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের দিকে সিকান্দার শাহ শূরের বিরুদ্ধে হিমু সেনাবাহিনী পাঠিয়েছিলেন সেই সময় সিকান্দার শূর পালিয়ে শিবালিক পর্বতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে জয়লাভের পর ১৫৫৭ খ্রিস্টাব্দে বৈরাম খাঁ তাঁর বিরুদ্ধে পুনরায় সেনাবাহিনী পাঠান এই সময় সিকান্দার শাহ বশ্যতা স্বীকার করে একটি জায়গীর লাভ করেন।

আকবরের অভিভাবক বৈরাম খাঁর মৃত্যু
১৫৬০ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট আকবর বৈরাম খাঁর অভিভাবকত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তাঁকে মক্কায় পাঠিয়ে দিলে যাবার পথে বৈরাম খাঁর মৃত্যু হয়। বৈরাম খাঁর মৃত্যুর পর আকবর ১৫৬০–১৫৬৪ পর্যন্ত সময়কালে ধাত্রীমাতা মহাম আনগা,তাঁর পুত্র আদম খাঁ,রাজমাতা হামিদা বানু বেগম মুনিম খাঁ প্রমুখের দ্বারা সম্পূর্ণরূপে পরিচালিত হন।
তাই ইংরেজ ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট স্মিথ ১৫৬০ – ১৫৬৪ পর্যন্ত সময়কালকে “Period of Petticoat Government” বা “অন্তঃপুরিকার শাসন”- বলে অভিহিত করেছেন। আকবর ষড়যন্ত্রের কথা বুঝতে পেরে ১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দে আদম খানকে মৃত্যুদণ্ড দেন এবং আদম খাঁর বৃদ্ধা মাতা মহাম আনগা ভগ্ন হৃদয়ে ধরিত্রী মায়ের কোলে লুটিয়ে পড়েন।আকবর তাঁর সিংহাসনকে নিষ্কণ্টক করার জন্য তাঁর বিদ্রোহী ভাই মির্জা মহম্মদ হাকিমের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন এবং তাকে উচিৎ শিক্ষা দেন।

রাজপূত দের সঙ্গে সম্পর্ক
সম্রাট আকবর ভারতে আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে যে রাজপুতদের সহযোগিতা প্রয়োজন তা তিনি উপলব্ধি করতে পেরে রাজপুতদের সাথে আত্মীয়তা সম্পর্ক স্থাপনের প্রয়াস নিয়েছিলেন। সম্রাট আকবর বুঝতে পেরেছিলেন যে রাজপুতরা শত্রু হিসেবে প্রবল এবং মিত্র হিসেবে নির্ভর যোগ্য। তাই তিনি রাজপুতদের সাথে সন্ধি করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিছুটা যুদ্ধের দ্বারা এবং কিছুটা বৈবাহিক সূত্রের দ্বারা এই প্রয়াসে তিনি সফল হয়েছিলেন। অম্বরের (আজমীরের) রাজা বিহারীমলের কন্যা যোধাবাঈকে (মরিয়ম) বিয়ে করেন। বিহারীমলের পুত্র ভগবান দাস আকবরের রাজসভায় নবরত্নের অন্যতম ছিলেন এবং ভগবান দাসের কন্যা মানাবাঈ এর সাথে তাঁর পুত্র জাহাঙ্গীরের (সেলিম) বিবাহ দেন। ভগবান দাসের পুত্র রাজা মানসিংহ আকবরের বিশাল সেনাবাহিনীর সেনাপতি হয়েছিলেন।

রাজা টোডরমল ছিলেন আকবরের অর্থমন্ত্রী। আরএক রাজপুত বীরবল (মহেশ দাস) ছিলেন সম্রাট আকবরের সবচেয়ে কাছের বন্ধু ও প্রিয় পাত্র। বেশিরভাগ রাজপুত যখন আকবরের দখলে চলে আসছে তখন একমাত্র মেবারের রাজপুত রাজা মহারানা উদয় সিংহ মুঘলদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। চিতোরের পতনের পর তিনি উদয়পুর পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকে রাজপুতদের একত্রিত করতে চেষ্টা করেছিলেন।

তাঁর পুত্র মহারানা প্রতাপসিংহ সারাজীবন মুঘলদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যান। প্রতাপসিংহ আকবরের বশ্যতা স্বীকার না করলে এবং আকবর চিতোর দুর্গে আক্রমণ করলে তাঁরা পালিয়ে যান । তিনি আর কখনো রাজ্য স্থাপন করতে পারেননি,সেই সঙ্গে রাজপুতদের একত্রিতও করতে পারেন নি। মেবারের একমাত্র রাজপুত জাত- যারা রাজ্য হারিয়ে ভিখারি হয়েছেন তবুও মুঘলদের আনুগত্য মেনে নেননি।

১৫৬২ খ্রিস্টাব্দে আকবর এক আইন জারি করে হিন্দু যুদ্ধ বন্দীদের ক্রীতদাস বানানোর আইন বন্ধ করে দেন। ঠিক পরের বছর অর্থাৎ ১৫৬৩ আকবর খ্রিস্টাব্দে হিন্দুদের উপর থেকে তীর্থকর তুলে দেন। সম্রাট আকবরের শাসনকালে বাংলায় মুঘল রাজত্বের প্রসার ঘটে। বাংলার সুলতান দাউদ কররানির বিরুদ্ধে মুনিম খানকে বাংলা অভিযানে পেরণ করেন,দাউদ কররানি পালিয়ে যান এবং মুঘলদের হাতে দাউদের পতন ঘটে।

আকবরের ধর্মীয় নীতি :
আকবরের মা হামিদা বানু বেগম ছিলেন পারসিক শিয়া মৌলবী মীর বাবা-দোস্ত-আলি-জামির কন্যা। পারসিক পন্ডিত ও যুক্তিবাদী মানুষ আব্দুল লতিফ ছিলেন আকবরের গৃহ শিক্ষক। আকবর মূলতঃ আব্দুল লতিফ ও পারসিক শিক্ষক পীর মহম্মদের কাছ থেকে “সুলহ্-ই-কুল” বা সকল ধর্ম সমন্বয়ের শিক্ষা নেন। দ্বিতীয়ত আকবরের জীবনে রাজপুত মহিষীদের প্রভাব এবং শেখ মুবারক ও তাঁর দুই পুত্র ফৈজি ও আবুল ফজলের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব তাঁকে ধর্মীয় ব্যাপারে গভীর ভাবে প্রভাবিত করে।এছাড়াও বিভিন্ন ধর্মমতের প্রচারকদের সান্নিধ্যে তাঁর মনে ধর্মীয় ব্যাপারে গভীর বাতাবরণ সৃষ্টি করে- তাঁরই বহিঃপ্রকাশ ঘটে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে।

ইবাদৎখানা :- ইবাদৎখানা ছিল মুঘল সম্রাট আকবর কতৃক ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে ফতেপুর সিক্রিতে প্রতিষ্ঠিত একটি ধর্মালোচনা সভা। বিভিন্ন ধর্মের বিষয় আলোচনা,প্রকৃত ধর্মের মূল সত্য নির্ণয় এবং এর সাথে ঈশ্বর শক্তির সম্পর্ক নির্ণয় করতে এবং ধর্মীয় বিভেদ দূর করতে এটি আকবর প্রতিষ্ঠা করেন।বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে আলোচনার জন্য বিভিন্ন ধর্মের পন্ডিতদের সেখানে আহ্বান করা হত।যেমন এখানে হিন্দু ধর্মের ব্যাখ্যাকার ছিলেন পুরুষোত্তম দাস ও দেবী।হরিবিজয়সুরী, বিজয়সেনসুরী ও ভানুচন্দ উপাধ্যায় ছিলেন জৈন ধর্মের ব্যাখ্যাকার।জরাথ্রুস্ট ধর্মমত ব্যাখ্যা করেন মহারাজাজি রানা এবং ছিলেন জেসুইট ধর্ম যাজক মনসারেট ও একায়াভাইয়া প্রমুখ। ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট স্মিথ এই ইবাদৎখানাকে “ First world Religious Parliament“- বলে অভিহিত করেছেন।বিভিন্ন কারণের ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে ইবাদৎখানা বন্ধ করে দেন।
মাজহারনামা :- ১৫৭৯ খ্রিস্টাব্দের ২ রা সেপ্টেম্বর শেখ মুবারক রচিত ঘোষণাপত্র আগ্রা থেকে জারি করে বলেন ইসলাম ধর্ম বা কোরানের কোনো ব্যাখা নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে সম্রাটের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে।অর্থাৎ এই নির্দেশনামা নিজেকে “ইমাম-ই-আদিল” বা ঐসলামিক আইনের চূড়ান্ত ব্যাখ্যাকার বলে ঘোষণা করেন।এটিই মাজহার নামে খ্যাত।স্মিথ এই ঘোষণাপত্রটিকে “Infallibility Degree” বা “অভ্রান্ত নির্দেশনামা”- বলে উল্লেখ করেছেন।

দীন-ই-ইলাহী ধর্মমত :-
জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে মুঘল সম্রাট আকবর ১৮২ খ্রিস্টাব্দে যে একেশ্বরবাদী ধর্মমতের প্রবর্তন করেন তার নাম “দীন-ই-ইলাহী” এর অর্থ হল দৈবাদেশ– যেখানে সবধর্মের সার কথা বলা হয়েছে।এর আদর্শ “সুল-ই-কুল” বা পরধর্ম সহিষ্ণুতা।এতে কোনো সাম্প্রদায়িকতা-দেবতা-মন্দির-পুরোহিত বা ধর্মগ্রন্থের কোনো স্থান নেই।যেকেউ এই ধর্মমত গ্রহণ করতে পারত। সম্রাট আকবর স্বয়ং ছিলেন এর প্রবক্তা। এর দিকগুলি ছিল নিরামিষ ভোজন-দানধর্ম পালন-পরস্পরকে আল্লাহ আকবর সম্বোধন এবং সম্রাটের প্রতি আনুগত্য। ১৮ জন বিশিষ্ট মুসলমান ও বীরবল(আসল নাম মহেশ দাস) নামে এক হিন্দু আমীর এই ধর্মমত গ্রহণ করেন। রাজা মানসিংহ ও ভগবান দাস “দীন-ই-ইলাহী”- গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন।ঐতিহাসিক স্মিথ তাঁর এই নতুন ধর্মমতকে “চরম বুদ্ধিহীনতার স্মৃতিস্তম্ভ”- বলে উল্লেখ করেছেন। তবে আকবরের সমালোচক ঐতিহাসিক আব্দুল কাদের বদাউনি আকবরের এই নতুন ধর্মমতকে “তৌহিদ-ই-ইলাহী”- বলেছেন।

আকবরের শাসনব্যবস্থা :-
শাসন ব্যবস্থায় সম্রাট আকবর ছিলেন সর্বেসেরা। সম্রাটের পরে স্থান ছিল ভকিল বা প্রধানমন্ত্রীর। দেওয়ান বা উজির ছিলেন অর্থ বা রাজস্ব বিভাগের প্রধান। মীরবক্সী ছিলেন সামরিক প্রধান।”সদর উস-সুদূর”-ছিলেন ধর্ম ও দাতব্য বিভাগের প্রধান। “কাজি-উল-জাকাত” ছিলেন প্রধান বিচারপতি। ধর্মনিরপেক্ষ বিচারকে বলা হত “মীরআদল”।মীরসমান ছিলেন সম্রাটের গৃহ পরিচালনার ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী। “দিওয়ান-ই-বায়ুতাত”- ছিলেন কারখানা দেখাশুনার ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী। “দিওয়ান-ই-খালিসা”(চাষ যোগ্য জমি),”দিওয়ান-ই-ট্যান” (জায়গীর), “মুসরিফ-ই-মুমালিক” (মহা গণনিক), “দারোগ-ই-ডাকচৌকি”(পোস্ট মাস্টার), “মীর-ই-আর্জ”(দরখাস্ত),”মীর-ই-তোজক”(অনুষ্ঠান দেখাশুনাকারী), “মীর-বাহরী”(নৌকা ও জাহাজ),”মীর-ই-মাল” (রাজকীয় কোষাগার),”মীর-মঞ্জিল”(ঘরবাড়ি),“মীর-আতিল” (পদাতিক বাহিনীর প্রধান),”ওয়াকিয়ানবিশ” (সংবাদ প্রেরক),”কুফিয়া নবিশ”(গোপন চিঠি লেখক),এবং “কারকারাজ”( গুপ্তচর)।এছাড়াও মনসদারদের দেখার জন্য ছিল “দিওয়ান-ই-বক্শী”-নামক কর্মচারী। আকবর তাঁর সাম্রাজ্যকে ১৫ টি সুবা বা প্রদেশে ভাগ করেন। সুবার শাসনকর্তাকে সুবাদার বা সিপাহসলা বলা হত। সুবাদার ছাড়াও প্রত্যেক প্রদেশে একজন করে দেওয়ান থাকতেন। প্রত্যেকটি সুবা কয়েকটি সরকারে এবং প্রত্যেকটি সরকার কয়েকটি পরগনায় এবং প্রতিটি পরগনা কয়েকটি গ্রামে বিভক্ত ছিল। ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আকবরের দেওয়ান পদে নিযুক্ত হয়ে (রাজস্বমন্ত্রী) টোডরমল ভূমি রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষেত্রে যে নতুন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন, তা টোডরমল ব্যবস্থা নামে খ্যাত। এটাই মুঘল ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা। এই ভূমি ব্যবস্থা তিন প্রকার যথা জাবতি বা দহশালা,গাল্লাবক্স ও নকস্।এর মধ্যে জাবতি বা দহশালা ব্যবস্থার জন্য টোডরমল খ্যাতি পান।টোডরমল ব্যবস্থার ফলে জমি জরিপ করে জমির উৎপাদিকা শক্তি ও জমির প্রকারভেদ- এইসব ভিত্তিতে বিভিন্ন অঞ্চলে এই তিন ধরনের ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। জাবতি প্রথা প্রথা হল জমির উৎপাটপাদিকা শক্তি নির্ভর করে জমিকে চার ভাগে ভাগ করা হয় যথা পোলাজ,পৌরতি,চাচর এবং বানজার।প্রথম তিন শ্রেণীর জমির বিগত দশ বছরের উৎপাদনের গড় হিসাব করে উৎপন্ন ফসলের ১/৩ অংশ রাজস্ব ফসলে বা নগদে নির্ধারিত হত।উত্তর ভারতের বিস্তৃন অঞ্চলে (যেমন দিল্লী-লাহোর-মুলতান-আগ্রা- এলাহাবাদ-অযোধ্যা-মালব এবং বিহার এই আটটি প্রদেশে চালু ছিল) এই ব্যবস্থা চালু ছিল।একে “দহশালা”ও বলে। গাল্লাবক্স বা বাতাই প্রথা চালু ছিল সিন্ধু প্রদেশ, কাশ্মীর,কান্দাহার ও কাবুলে এবং নকস্ বা নাক্স ব্যবস্থা চালু ছিল কাঁথিয়াবার, বাংলাদেশ ও গুজরাটে।গ্রামস্তরে রাজস্ব আদায় করত পাটোয়ারী।পরগনা স্তরে রাজস্ব আদায় করত কানুনগো।এছাড়াও কানুনগো তাকাভি ঋণ দানে কৃষদের সাহায্য করত।সরকার বা জেলাস্তরে খাজনা আদায় করত আমিল বা ক্রোরি (এদের সংখ্যা ছিল ১৮২ জন), তাকে সাহায্য করত কারকুন (Accountant) ও খাজনাদার(কোষাধ্যক্ষ)।প্রদেশের রাজস্ব বিভাগের প্রধান ছিলেন দেওয়ান। মুঘল শাসনকে স্থায়িত্ব ও সংহতি দিতে এবং রাজকীয় সেবার ঐতিহ্য গড়ে তুলতে মুঘল সম্রাট আকবর পারস্যদেশের অনুকরণে ১৫৭০ খ্রিস্টাব্দে পদমর্যাদা অনুযায়ী সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারীদের যে ধাপে ধাপে ভাগ করেছিলেন সেগুলিকে মনসব (পদমর্যাদা) বলা হয়। মনসব যারা পেতেন তাদের বলা হত মনসবদার। মনসবদাররা যে পদমর্যাদা অনুযায়ী বেতন পেতেন তা থেকে নির্দিষ্ট সেনা ও ঘোড়া রাখতেন। যুদ্ধকালে সম্রাটকে তাঁরা সেনা পাঠাতেন। সর্বনিম্ন ১০ এবং সর্বোচ্চ ১০০০০ পর্যন্ত ধাপের মনসবদার ছিলেন। মনসবদার পদের সঙ্গে ‘জাট’ ও ‘সওয়ার’ শব্দ দুটি জড়িয়ে আছে। এই শব্দ দুটির ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলে অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে ‘জাট’ হল একজন মনসবদারের পদমর্যাদা ও বেতন। আর সওয়ার’ হল একজন মনসবদারের অধীনে কতজন অশ্বারোহী সেনা থাকবে তার হিসাব।ঘোড়ার গায়ে চামড়া পুড়িয়ে ক্রমিক নম্বর দেওয়া হত একে বলা হত ‘দাগ’। হুলিয়া ছিল সৈনিকদের দৈনিক বিবরণ লিখে রাখা। মুঘল যুগে জায়গীর প্রথার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল জমা ও হাসিল।

সাহিত্য :
মুঘল সম্রাট আকবর নিরক্ষর হলেও সাহিত্যের যেমন পৃষ্ঠপোষ ছিলেন তেমনি সাহিত্যনুরাগী ছিলেন।তাঁর আমলে তুলসী দাস “রামচরিতমানস”-গ্রন্থ লেখেন। এই সময় “সুরসাগর” গ্রন্থটি তৈরি করেন সুরদাস। তিনি এতটাই সাহিত্যনুরাগী ছিলেন যে তাঁর রাজসভায় কবিপ্রিয় বীরবল এবং রাজপ্রাসাদের শ্রেষ্ঠ রাজকীয় কবি আব্দুর রহিম খান-ই-খানান বিরাজমান করতেন। আকবরের সময় অনেক গুলি বই অনুবাদ করা হয়।”অথর্ববেদ” ফার্সীতে অনুবাদ করেন ইব্রাহিম-সিরহিন্দ-শেখ সুলতান এই তিনজনে মিলে। আবুল ফজলের দাদা ফৈজি “লীলাবতী”ও “নলদময়ন্তী” গ্রন্থ।হরিবংশ পূর্ব অনুবাদ করেন মৌলানা সুরি।”পঞ্চতন্ত্র”-অনুবাদ করেন আবুল ফজল।ফার্সীতে রামায়ন অনুবাদ করেন আব্দুল কাদের বদাউনি।’জাতক’ ফার্সিতে অনুবাদ করেন মখমল খাঁ।কাশ্মীরের ইতিহাস ফার্সিতে অনুবাদ করেন মৌলানা শাহ।ভুতিনাম ও কোকশাস্ত্র ফার্সিতে অনুবাদ করেন জিয়া নাক্সবন্দী। থেমে থাকেনি স্বয়ং সম্রাট আকবরও তিনি মহাভারতকে ফার্সিতে অনুবাদ করেন আবুল ফজলের সাহায্যে এবং তিনি মহাভারতের নাম দেন “রজমনামা”।

শিল্প সংস্কৃতি ও স্থাপত্য :-
সম্রাট আকবর শিল্প সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের যথেষ্ট সমজদার ব্যক্তি ছিলেন আকবরের সময় দিল্লীতে হুমায়ুনের সমাধি মন্দির তৈরি করা হয়। তিনি ফতেপুর সিক্রিতে সেলিম চিস্তির সমাধি নির্মাণ করেন। এছাড়াও জামি মসজিদ, যোধাবাঈের রাজপ্রাসাদ,মরিয়ম এবং সুলতান রাজপ্রাসাদ,বীরবলের বাড়ি,দেওয়ান-ই-আম, দেওয়ান-ই-খাস,সিকেন্দ্রায় আকবরের সমাধি এবং গুজরাট জয়ের স্মৃতি হিসেবে ১৬০২ খ্রিস্টাব্দে বুলন্দ দরওয়াজা (১৭৬ ফুট উচ্চতা),ফতেপুর সিক্রি ও এলাহাবাদ দুর্গ নির্মাণ তাঁর স্থাপত্য শিল্পের পরিচয় বহন করে। আকবরের প্রধান চিত্রকর ছিলেন মীরসৈয়দ আলি ও আব্দুস সামাদ (ইরান থেকে আনা হয় এই দুই জনকে),যশোবন্ত,মিশকিনা, বসোয়ান প্রমুখ।তাঁর সময়ে রজমনামা(মহাভারত)র চিত্র গুলি আঁকা হয়।রজমনামাতে ৬৯ টি পৃষ্ঠা ছিল তাঁর মধ্যে ১২ টি এঁকেছিলেন বসোয়ান।মীরসৈয়দ আলি ও আব্দুস সামাদ “দস্তান-ই-আমীর-হামজা”- নামের চিত্রগুলি আঁকেন।মিশকিনা দারাবনামাতে ছবি আঁকেন।আকবরনামাতে ছবি আঁকেন শঙ্কর, দৌলত,গোবর্ধন,এনায়েৎ ও পিন্ডরক।

আকবরের চরিত্র,কৃতিত্ব ও বিদেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক:-
সম্রাট আকবরের মহানুভবতার সাথে বাস্তব জীবনের কিছু পরিচয় সুস্পষ্ট ভাবে প্রস্ফুটিত হয়েছে তাঁর কর্মের মাধ্যমে- তাঁরই নিদর্শন হল ১৫৬৩ খ্রিস্টাব্দে হিন্দুদের উপর থেকে জিজিয়া কর তুলে দেওয়া এবং দাস প্রথা ও সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করে বিধবা বিবাহ প্রথা চালু করে শ্রেষ্ঠ শাসকের পরিচয় দিয়েছিলেন।বিবাহের বয়স ছেলেদের ক্ষেত্রে ১৬ বছর এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে ১৪ বছর নির্দিষ্ট করে দেন। আকবরের সাথে অন্যান্য দেশের বৈদেশিক সম্পর্ক ভালো ছিল যার দরুন তার রাজসভায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশের এসেছেন। তাঁর সময়ে পর্তুগিজ দূত হিসেবে অ্যান্টিনিও ক্যাব্রাল আকবরের দরবারে আসনে।আকবর হাজী আব্দুল্লাকে দূত হিসেবে পর্তুগিজদের কাছে পাঠান।ফাদার রুডলফ দূত হিসেবে তাঁর রাজসভায় আসেন। ১৫৮৩ খ্রিস্টাব্দে লিও গ্রেমন্ট পর্তুগিজ দূত হিসেবে আকবরের রাজসভায় আসেন। ১৫৯৫ খ্রিস্টাব্দে জেরম জেভিয়ার ও ফাদার এমানুয়েল পিনরো আকবরের দরবারে আসেন।1595 খ্রিস্টাব্দে বেনেডিক্ট দিয়োগ লাহোরে আসেন।এই ভাবে আকবর বৈদেশিক সম্পর্কের মাধ্যমে মুঘল সাম্রাজ্যকে ঐতিহাসিক সাম্রাজ্যে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। আকবর পারসিক উৎসব নওরোজ চালু করেন এবং সেই সঙ্গে চালু করেন পারসিক সৌর ক্যালেন্ডার।আকবর জৈন পন্ডিত হরিবিজয়সুরীকে “জগতগুরু”-উপাধি দেন এবং জিনচন্দ্রসূরীকে “জগপ্রধান”- উপাধি দেন। আকবরের সময় প্রথম দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয় ১৫৯৪ – ১৫৯৮ খ্রিস্টাব্দে। আকবরের নির্দেশে বৈরাম খাঁকে হত্যা করেন মুবারক খান। আকবর খুব সুন্দর নাগারা বাজাতে পারতেন।আকবরের রাজসভায় বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ ছিলেন তানসেন। তাঁর আসল নাম রামতনু পান্ডে।মল্লার, তোড়ি,সরং ইত্যাদি হল তানসেনের আবিষ্কৃত গুরুত্বপূর্ণ রাগ-রাগিনী।

শেষ জীবন :
১৬০৬ খ্রিস্টাব্দের ২৭ শে অক্টোবর মধ্যরাতে আমাশয়ে আক্রান্ত হয়ে মুঘল সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ শাসক আকবর মৃত্যু বরণ করেন ফতেপুর সিক্রিতে(আগ্রা)। এই মহান সম্রাটকে সেকেন্দ্রায় সমাধিস্থ করা হয়। মুঘল সম্রাট আকবরের রাজপুত তথা হিন্দুদের প্রতি যেমন তাঁর নমনীয়তা-শ্রদ্ধা তাঁকে সাম্রাজ্যের ভিত্তি ও সুদৃঢ়করণে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল তেমনি তাঁর স্থাপত্য,সাহিত্য চিত্র শিল্পগুলি বর্ণে ও রেখায় ভাবে ও ব্যঞ্জনায় আবাল বৃদ্ধ বনিতার মন জয় করে নিয়েছিল যা তাঁর সাম্রাজ্যের নতুন দিগন্তের পথকে প্রসস্থ করেছিল।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।